শিক্ষার বেসরকারিকরণ
- আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৯:৩৮:২০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৯:৩৮:২০ পূর্বাহ্ন
অধ্যক্ষ প্রফেসর মামুনুর রশীদ::
মানব শিশুর শিক্ষার শুরুটা হয় নিজ নিজ পরিবারে। ভালো হোক, খারাপ হোক, পারিবারিক শিক্ষার প্রভাব ব্যক্তির পরবর্তী জীবনে স্থায়ীভাবে ছাপ রেখে যায়। এটা একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্তর। স্বল্পকাল স্থায়ী। বয়স খানিকটা বাড়লেই মানব শিশুকে প্রবেশ করতে হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্তরে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্তর মানে প্রাইমারি স্কুলে বা মক্তবে। এগুলো প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। পারিবারিক আবহের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্তর অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হয় বিভিন্ন স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে। একেক দেশে এটা একেক রকম হয়।
ধ্রুপদী চিন্তায় শিক্ষা কোনো পণ্য নয় - যা বিকি কিনি করা যায়। কিন্তু বিংশ শতকের বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক আর্নল্ড টয়নবি (অৎহড়ষফ ঞড়ুহনবব) তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ঝঃঁফু ড়ভ ঐরংঃড়ৎু গ্রন্থে দুর্দান্ত সাহসের সাথে শিক্ষাকে পণ্যের পর্যায়ে বলে মতপ্রকাশ করলেন। অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবসাযোগ্য পণ্য। কিন্তু পণ্য কেন? শিক্ষাতো বিমূর্ত মানসিক মেধাগত একটি প্রক্রিয়া। টয়নবি দেখালেন, পুঁজিবাদী দুনিয়ায় ধনতন্ত্রের সর্বগ্রাসী বেনোজলে শিক্ষার মতো বিমূর্ত বিষয়ও পণ্যে পরিণত হয়েছে। তার প্রমাণ দেশে দেশে শিক্ষার সরকারি নিয়ন্ত্রণের সমান্তরালে বেসরকারি শিক্ষা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণজোয়ার। বাংলাদেশে সরকারসমূহের আনুকূল্যে ও অনুমতিতে নব্বই দশকে গড়ে ওঠা শিক্ষার বেসরকারিকরণ হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণ হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে, শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়ন ও পরিচালনা সরকারি বা রাষ্ট্রীয় খাতের পরিবর্তে বেসরকারি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। এখানে গুণগত শিক্ষার প্রসার একটি লক্ষ্য থাকে বটে, কিন্তু মূল থাকে মুনাফা। মুনাফা হোক, ক্ষতি নেই, কিন্তু একেকটি প্রতিষ্ঠান একটি মিশন ও ভিশন প্রতিষ্ঠার নামে কিন্ডারগার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে বসছে। সরকার গুণগত মানের অভাব, রীতিমতো ক্লাস না হওয়া, একই ক্লাস কক্ষে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর গাদাগাদি অবস্থান, ক্লাস চলাকালীন শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে ঝুঁকে পড়া, ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসবিমুখতা, প্রাথমিক স্কুলগুলোতে সরকারি শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময়ে কখনো উপস্থিত না থাকা - ইত্যাদি নানা কারণে সচেতন অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীরা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
শিক্ষার বেসরকারিকরণের অনেকগুলো কারণও আছে: প্রথমমত, সরকারের জন্য সীমিত বাজেটের কারণে এসব বর্ধমান জনসংখ্যার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। যেহেতু কঠিন হয়ে পড়ে, সেহেতু সরকার সমূহ একই কারিকুলামের অধীনে সমান্তরাল অন্য একটি শিক্ষা পদ্ধতি অনুমোদন দিচ্ছে। এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার ব্যাপারে আইনসিদ্ধ স্বাধীনতা দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগিতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জবাবদিহিতা বেশি থাকে; ফলে কারিকুলামভিত্তিক শিক্ষা প্রদানে কারো পক্ষে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয় না। ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনা, সিলেবাস সমাপ্ত করা, শিক্ষকদের ক্লাসে উপস্থিতি; ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে উপস্থিতি বিষয়ে প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে পরিচালনা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং একাডেমিক অগ্রগতির জন্য
বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
তৃতীয়ত, তাছাড়া সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মেডিকেল ও কারিগরিতে উচ্চশিক্ষার চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এবার বেসরকারি শিক্ষার নেতিবাচক দিক সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক। যদি ধরে নিই যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা আছে, তবে এটা মানতেই হবে যে অতিরিক্ত টিউশন ফি খরচের কারণে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা এই মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষার বেসরকারিকরণে শিক্ষাকে একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়, যা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যা শিক্ষা সম্পর্কিত সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সংগতিবিহীন। একটি বিষয় মনে রাখা দরকার; ভালো যেকোন বিষয়ে প্রতিযোগিতা থাকা দরকার; শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। এতে করে শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো ভালো প্রতিষ্ঠান বেছে নেয়ার সুযোগ পায়। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার অর্থাৎ উন্নত ব্যবস্থাপনা যুক্ত থাকলে ভালো ভালো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এগুলো পরিচালনার জন্য পরিচালনা পরিষদ, শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক, অফিস স্টাফ, ছাত্রছাত্রী প্রয়োজন হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগ যেহেতু ব্যবসা মনোবৃত্তি স¤পন্ন, তাই শিক্ষার মান অর্জনের সাথে এটা সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠছে, যা কাক্সিক্ষত নয়।
আমরা মনে করি নি¤œবর্ণিত সূচকগুলো উত্তর ইতিবাচক হলে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সফল বলা যেতে পারে। এ বিষয়টি প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রযোজ্য। দেখতে হবে-
১। একটি অনুকূল শিক্ষাবান্ধব নিরিবিলি ক্যাম্পাস আছে কিনা?
২। প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারক পরিচালকম-লী, শিক্ষা উন্নয়নমুখী, সুশিক্ষিত, প্রশিক্ষিত, সৎ, দক্ষ এবং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্ভাবনী ও সৃজনী শক্তি গুণ সম্পন্ন কিনা।
৩। একটি স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিধিসম্মতভাবে মেধাবী, অভিজ্ঞ, যোগ্য ও শিক্ষকতার গুণস¤পন্ন শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে কিনা।
৪। বর্তমান যুগের সাথে ন্যূনতম সংগতিস¤পন্ন সম্মানজনক বেতন কাঠামো আছে কিনা।
৫। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের (পদবী যা-ই হোক) শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কাজে প্রশাসনিক গতিশীলতা আছে কিনা।
৬। প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদেরকে পড়–য়া, আইন মেনে চলা, শৃঙ্খলা পরায়ণ, ক্লাস ও বহুমুখী করে তোলা হচ্ছে কিনা।
৭। প্রতিষ্ঠানে ছুটি বিধি, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা বিধি ছাত্রছাত্রীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য বিধিবদ্ধ আইন-কানুন আছে কিনা।
৮। শিক্ষাক্রম বহির্ভূত কার্যক্রম, যেমন- ক্রীড়া, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ অন্যান্য মোটিবশনেল প্রোগ্রাম কার্যকর কিনা।
৯। ভর্তির সময় ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের যে সকল ওয়াদা বা কমিটমেন্ট দেয়া হয়, সেগুলো যথাযথভাবে কার্যকর হয় কি-না।
১০। উত্তোলিত অর্থের কত শতাংশ কলেজ ও শিক্ষা উন্নয়নে ব্যয় হবে, এই মর্মে কর্তৃপক্ষ ওয়াদাবদ্ধ কিনা।
১১। উত্তোলিত অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য বছরে অন্তত দুটি অডিট কমিটি সক্রিয় আছে কিনা, তার একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গঠিত অভ্যন্তরীণ অডিট টিম এবং অন্যটি বিধিবদ্ধ কোন অডিট ফার্ম বা টিম। সর্বোপরি,
১২। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের কোন মাস্টারপ্ল্যান বা রোডম্যাপ আছে কিনা।
উপসংহারে বলা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নিশ্চিতের এমন অসংখ্য দিকের কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করা হল। আরো অনেক কিছু বাকি থাকে। সময়ের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে এগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত করতে হবে। না হলে শিক্ষার গুণ-মান উন্নয়ন, শিক্ষাসেবি ইত্যাদি বিশেষণে নিজেদের পরিচয় দেয়া যা জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে থাকবে; এবং আম গাছে আর আম ফলবে না, আমড়াই ধরতে থাকবে।
আমরা সরকারি শিক্ষার পাশাপাশি চলমান বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অভিনন্দন জানাবো, যদি তা উন্নয়নশীল একটি দেশের মানবশিশুকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য মেধাবী ও উদ্ভাবনী শক্তিস¤পন্ন মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক